ইচ্ছা করলেই ফ্রিল্যান্সিং করা যায়, কিন্তু কথা হল আপনার ইচ্ছাশক্তি কতটুকু

ইচ্ছা করলেই ফ্রিল্যান্সিং করা যায়, কিন্তু কথা হল আপনার ইচ্ছাশক্তি কতটুকু

টেক প্রো টিউনস : Faimust Software এর কাজ এবং লক্ষ্য জানতে চাচ্ছি  

ফয়সাল মোস্তফা : Faimust Software মূলত ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ইআরপি সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং রেপুটেশন মেনেজমেন্ট নিয়ে কাজ করছে। দেশের বাইরের ক্লায়েন্টদের জন্য আমাদের যতগুলো বিজনেস ওয়েবসাইট আছে সবগুলো ফাইমাষ্ট সফটওয়্যারের অধীনেই পরিচালিত হয়। সম্প্রতি Faimust Software এর কাজের পরিধি আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যে USA তে আমরা Faimust LLC নামে একটি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করেছি, যার কার্যক্রম খুব তাড়াতাড়ি শুরু করবো আমরা। 

 

টেক প্রো টিউনস : বাইরের দেশে ডিজিটাল মার্কেটিং এর চাহিদা অনেক আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল মার্কেটিং এর ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন

ফয়সাল মোস্তফা : আমরা এখনো ডেভেলপিং কান্ট্রি, উন্নত দেশগুলোর সাথে আমাদের কিছু পার্থক্য থাকবেই। যেই প্রযুক্তি তারা আজ ব্যবহার করছে সেটাই আমাদের কাছে আসতে আসতে কিছু সময় লাগে। তবে আশার কথা হচ্ছে আমাদের দেশেও এখন ধীরে ধীরে ডিজিটাল মার্কেটিং এর প্রসার শুরু হচ্ছে। এখন প্রায় সব কোম্পানি তাদের প্রচারের জন্য স্যোশাল মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করছে, পিপিসি অ্যাড দিচ্ছে, ওয়েবসাইটের সংখ্যা বাড়ছে, অনলাইনে কেনা বেচা বাড়ছে মানুষের। যেহেতু প্রযুক্তির এই জোয়াড় একবার শুরু হয়ে গেছে, এটা বাড়তেই থাকবে। যেহেতু আমরা ডিজিটালাইজড হচ্ছি,  আমাদের লোকাল মার্কেটে ডিজিটাল মার্কেটিং এর চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যত দিন যাবে এই চাহিদা আরো বাড়বে।

 

টেক প্রো টিউনস : ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে যদি কথা বলি, একটু বলবেন কি যারা মনে করে ইচ্ছা করলে ই ফ্রিল্যান্সিং করা যায়, ঘরে বসে বসে খুব সহজেই, আসলেই কি ব্যাপারটা তাই?

ফয়সাল মোস্তফা : ইচ্ছা করলেই ফ্রিল্যান্সিং করা যায়, কিন্তু কথা হল আপনার ইচ্ছাশক্তি কতটুকু। কেউ ইচ্ছা করেই বসে থাকে, আর কেউ সেটাকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য পরিশ্রম করে। আমি সবসময় একটা কথা বলি, সেটা হল মেধা, পরিশ্রম, সততা আর অধ্যবসায় – এই চারের মিশ্রণ যদি সঠিক মাত্রায় করা যায় তাহলে সফলতা নিশ্চিত। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে আগে। একজন ক্লায়েন্ট যে কিনা আপনাকে চিনে না জানে না, সে কেন আপনার সাথে কাজ করতে যাবে। অবশ্যই আপনাকে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েই ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করতে হবে। আর এই সেক্টরটি যেহেতু পরিবর্তনশীল, তাই প্রতিনিয়ত নিজের কোয়ালিটিকে আপগ্রেড করতে হবে, তা না হলে দীর্ঘযাত্রায় আপনি ছিটকে পড়তে পারেন এই পেশা থেকে।

 

টেক প্রো টিউনস : ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস এ প্রায় ই ধস নামছে, আমাদের ছেলে মেয়েদের একাউন্ট ব্যান হচ্ছে তার একটা কারন নিয়ম ঠিক মত না নামা, কেন এরকম হচ্ছে আর কিভাবে এটা বন্ধ করা যায়

ফয়সাল মোস্তফা : নতুন যারা ফ্রিল্যান্সিং এ আসছে এরা হাজার হাজার ডলারের স্বপ্ন নিয়ে আসে, এদের ধারণা মার্কেটপ্লেসগুলোতে ডলার ভেসে বেড়ায়, ধরো আর পকেটে ভরো। তাই মার্কেটপ্লেসে জয়েন করেই এরা শর্টকাট খুঁজতে থাকে। এমনো কিছু মেম্বার আমি দেখেছি যারা বায়ারের রিকোয়েষ্ট এর সেকশনে গিয়ে বাংলা ভাষায় কাজ ভিক্ষা চায়। এভাবে নিজেকে যেমন ছোট করে, একই সাথে সারা দেশকে ছোট করে। যে কোনো মার্কেটপ্লেসের কিছু রুলস থাকে, মার্কেটপ্লেসে জয়েনের আগে সেগুলো ভালোমত পড়ে নেয়া উচিত। এখন ফেইসবুকে মার্কেটপ্লেসভিত্তিক গ্রুপগুলো খুব অ্যাক্টিভ। এখান থেকেও ব্যাসিক ধারনা পেতে পারে যে কেউ। আবার অনেক বাংলা ব্লগ আছে যেখান থেকে নতুনরা অনেক কিছু জানতে পারে। যেমন আমার ব্লগ www.faisal-mustafa.com এ আমি রেগুলার নতুনদের জন্য দিক-নির্দেশনামূলক পোষ্ট করে থাকি।

 

টেক প্রো টিউনস : ফাইবার নিয়ে কাজ করছেন, লিখছেন, জানতে চাই এটা কেন অন্য মার্কেটপ্লেস থেকে আলাদা এবং সম্ভাবনা কেমন

ফয়সাল মোস্তফা : ফাইভারে আমি মূলত বায়ার হিসেবে জয়েন করি। আমাদের ক্লায়েন্টদের জন্য অনেক ছোটখাটো সার্ভিস যেগুলো আমরা সরাসরি দেই না, ফাইভার থেকে কিনে সেগুলো প্রোভাইড করতাম। একদিন দেখলাম আমাদের সার্ভিসগুলো যদি ছোট পরিসরে ফাইভারে দেয়া যায় তাহলে সেল হতে পারে। সেই চিন্তা থেকেই ফাইভারে গিগ দেয়া এবং আল্লাহর রহমতে আমরা খুব সফলতার সাথে ফাইভারে সার্ভিস প্রোভাইড করে যাচ্ছি।

অন্য মার্কেটপ্লেসের সাথে ফাইভারের পার্থক্য হচ্ছে একানো কোনো সেলারকে বিড করে কাজ পেতে হয় না, সেলার তার সার্ভিসগুলোকে গিগ হিসেবে লিষ্টেড করে রাখে, বায়ারের যেটা পছন্দ সেটা সে অর্ডার করে। একটা সময় ছিল ফাইভারে শুধুমাত্র ৫ ডলারের সার্ভিস সেল হতো, কিন্তু এখন প্রতিটা অর্ডার থেকে সর্বোচ্চ ২০০০ ডলারের বেশিও আর্ন করা সম্ভব। তাই নি:সন্দেহে বলা যায়, ফাইভারে যে কোনো সেলারের সম্ভাবনা, অন্য যে কোনো মার্কেটপ্লেস থেকে বেশি।

 

টেক প্রো টিউনস : Fiverr Bangladesh নামে একটা গ্রুপ আছে আপনার, কি উদ্দেশ্য সেই গ্রুপের আর কেমন কাজ করছে সেই গ্রুপ

ফয়সাল মোস্তফা : Fiverr Bangladesh গ্রুপটি মূলত ফাইভারের মেম্বারদের নিয়ে গড়ে উঠেছে, গ্রুপের মাধ্যমে আমরা নতুন এবং পুরাতন মেম্বারদের বিভিন্ন সাপোর্ট দিয়ে থাকি। এটি ৩০ হাজার মেম্বারের একটা পরিবারের মত, যেখানে সবসময় পুরাতনরা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুনদের হেল্প করছে যাতে সবাই মিলে একসাথে ফাইভারে আরো ভালো করতে পারে।

 

টেক প্রো টিউনস : মার্কেটপ্লেস ছাড়া অন্য কোনভাবে  ফ্রিল্যান্সিং করা সম্ভব কি? সম্ভব হলে কিভাবে সম্ভব।

ফয়সাল মোস্তফা : মার্কেটপ্লেসে মোট ক্লায়েন্টের খুব নগন্য একটা ভাগ আছে, বাকিটা মার্কেটপ্লেসের বাহিরে। যে কোনো সফল ফ্রিল্যান্সারকেই আমি বলি নিজের একটা ব্র্যান্ড নেইম সিলেক্ট করে একটা ওয়েবসাইট তৈরি করে নিতে। সেই ওয়েবসাইটে আপনার সবগুলো সার্ভিস/প্রোডাক্ট ক্লায়েন্ট যাতে সরাসরি কিনতে পারে সেই ব্যবস্থা রাখেন। এবার আপনার ওয়েবসাইট এর মার্কেটিং করেন। যত বেশি ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছাতে পারবেন, আপনার সেল তত বাড়বে। প্রত্যেক ফ্রিল্যান্সারেরই উচিত এভাবে নিজের ওয়বসাইটটাকে ধীরে ধীরে পরিচিত করে তোলা যাতে শুধুমাত্র মার্কেটপ্লেসের উপর নির্ভর করে থাকতে না হয়।

 

টেক প্রো টিউনস :আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড BUET সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, সেখান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা পেশায় আসা, গল্পটা জানতে চাই

ফয়সাল মোস্তফা : গল্পটা ইন্টারেষ্টিং, সিভিল ইন্জিনিয়ারিং আমাকে কখনোই টানতো না, সেজন্যই মনে হয় ইট বালি সিমেন্ট আমার রক্তে মিশতে পারেনি। কম্পিউটার নিয়েই পড়ে থাকতাম বেশি সময়। বুয়েটে লেভেল ৪ এ থাকার সময় টার্ম ব্রেকে অনলাইন আর্নিং নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ তৎকালীন ওডেস্কে জয়েন করি। সেখানেই পরিচয় হয়ে যায় কানাডার এক কোম্পানির সাথে। তাদের থেকেই প্রথমে আমি কিছু কন্ট্রাক্টচুয়াল কাজ পাই। কিন্তু সমস্যা হল অভিজ্ঞতা এবং এসইও করার জন্য যে উন্নতমানের কিছু সফটওয়্যার তিনি আমাকে দেন, সেগুলো আমাদের তৎকালীন ব্রডব্যান্ড দিয়ে ঠিকমত চলতে পারত না। তাই বাধ্য হয়েই ফিলিপাইনথেকে ফ্রিল্যান্সার ভাড়া করতে হয়, যাদেরকে দিয়ে সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করাতাম। এভাবে দেখা যেত ক্লায়েন্ট থেকে যা পেমেন্ট পেতাম তার ৫০ শতাংশেরও বেশি চলে যেত প্রোভাইডারদের পারিশ্রমিকে। তারপরও রেগুলার কাজ পাওয়ার জন্য এবং সিস্টেমটাকে দাড়া করানোর জন্য আমি লেগে থাকলাম। আস্তে আস্তে কাজ পাওয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকলো। আমি কাজের ক্ষেত্রে সবসময়ই প্রফেশনালিটি বজায় রাখতাম, কাজের কোয়ালিটি এবং ডেডলাইনের দিকে মনযোগ রাখতাম। ফলে একসময় ক্লায়েন্ট আমার উপর এতটাই নির্ভর হয়ে পরে যে সে তার অন্য সব কন্ট্রাক্টর বিদায় করে দিয়ে শুধু আমাকেই কাজ দেয়া শুরু করে। ফলে কাজের চাপ বেড়ে যায়। হিসাব করে দেখলাম, ফিলিপিনো প্রোভাইডারদের দিয়ে কাজ না করিয়ে যদি নিজেই করা যায় তবে ৯০ শতাংশের উপরে লাভ থাকে। ব্যস, নিয়ে নিলাম প্রথম উদ্যোগ। দুইজনটিম মেম্বার নিয়ে নিলাম এবং ট্রেইন আপ করালাম, একটা বিল্ডিং এর ছাদের উপরে নিলাম প্রথম অফিস। এবার ক্লায়েন্ট থেকে কাজ এনে সরাসরি নিজেরাই করা শুরু করলাম। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বড় করতে থাকলাম। মার্কেটপ্লেস ছেড়ে নিজেদের ওয়েবসাইট দিয়ে মার্কেটিং শুরু করলাম। USA, Canada, UK, Australia ভিত্তিক কিছু কোম্পানির সাথে চুক্তি করলাম, ওরা ক্লায়েন্ট জোগাড় করতো, আর আমরা সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করতাম।

২০১৪ সালের জানুয়ারি। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে শুরু করলাম নিজের প্রতিষ্ঠান – ফাইমাষ্ট সফটওয়্যার। “ফাইমাষ্ট” নামকরণটি করেছি আমার নামের অংশ থেকে – Faisal Mustafa থেকে Faimust । ফাইমাষ্ট সফটওয়্যার তার নিজস্ব অফিসে যাত্রা শুরু করে ২০১৪ সালের ১লা জানুয়ারি। এবার শুর হয় কাজের পরিধি বাড়ানো এবং বিস্তৃত করা। বর্তমানে ফাইমাষ্ট সফটওয়্যার বিশ্বব্যাপী এসইও, অনলাইন মার্কেটিং, স্যোসাল মার্কেটিং, রেপুটেশন মেনেজমেন্ট ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করে আসছে। ভবিষ্যতেও ফাইমাষ্ট সফটওয়্যারকে নিয়ে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবার ইচ্ছা আছে।

 

টেক প্রো টিউনস : ফ্রিল্যান্সার থেকে এখন উদ্যোগটা, কিভাবে?

ফয়সাল মোস্তফা : এই প্রশ্নের জবাব মনে হয় আগের প্রশ্নেই দিয়ে ফেলেছি, আসলে রক্তে যার উদ্যোক্তার নেশা, তাকে কি আটকে রাখা যায়। আরো কিছু নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি, ইনশা আল্লাহ সেগুলোর সফলতার গল্পও শুনাতে পারবো ভবিষ্যতে। নিজেকে আরো ভালোভাবে প্রস্তুত করার জন্য Executive MBA শুরু করেছি NSU তে। উদ্যোক্তা জীবন চ্যালেন্জের, সবাই এই চ্যালেন্জ নিতে পারে না। যারা নিতে পারে, তাদের সফলতা আসবেই।

 

টেক প্রো টিউনস : ২০২১ সালে নিজেকে এবং নিজের প্রতিষ্ঠানকে কোথায় দেখতে চান।

ফয়সাল মোস্তফা : যেহেতু Faimust Software এখন USA তে এলএলসি (লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি) হিসেবে রেজিস্টার্ড, আগামী ২ বছর আমাদের পুরো ফোকাস থাকবে USA কে নিয়ে। একই সাথে ইউরোপিয়ান দেশ গুলোতেও কাজের পরিধি বাড়ানোর প্ল্যান আছে। সেই সাথে আরো কিছু নতুন সার্ভিস অ্যাড করতে চাই। আর Faimus Software কে আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত একটা ব্র্যান্ড হিসেবে দাড় করাতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের উপকারে কাজে লাগতে পারি।

 

 

আমার নাম আরিফুল। গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করি। লিখতে অনেক ভালোবাসি। মুলত আইটি বিষয়ক বিভিন্ন লেখা লিখি থাকি।আমি এই ব্লগের এডমিন। আশা করি আপনাদের ভালো কিছু আর্টিকেল দিতে পারবো যা পড়ে আপনারা উপকৃত হবেন। এটার সাথে আমি ই ক্যাব এবং জেনেসিস ব্লগে ও লিখে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *